রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০১:০৫ অপরাহ্ন

সব কটা জানালা খুলে দাও না।

সব কটা জানালা খুলে দাও না।

কমল সেন গুপ্ত।। তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন বরিশাল।শুধুই অন্ধকার। জাগরণ চাই একটা জাগরণ। গনশিক্ষা ব্যতিত গণজাগরন সম্ভব নয়। এমনি এক দুঃসময়ে বরিশাল এলেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত। সাল টা ১৮৮০। জিলা স্কুলে স্থান নেই। স্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রয়োজন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার। কিন্তু কার পরশে অন্ধকারের গায়ে ফুটবে নতুন নতুন তাঁরা। জ্বলবে আলোক শিখা। সবার দৃষ্টি ঐ মানুষটার দিকে। এলেবেলে কেউ নয়। মানুষ টা অশ্বিনী কুমার দত্ত। ফুটলো ভোরের আলো। বইলো নির্মল বাতাস। পিতার নাম অনুসারে নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোল, নাম ব্রজমোহন বিদ্যালয়। যাত্রা শুরু হল সেই স্কুলের। সত্যের নিশান গগনে তুলে, পবিত্রামৃত পবনে পূরে, ভাই বন্ধুগনে প্রেম-ডোর বাঁধি। তারিখটা ২৭ জুন, ১৮৮৪।
শিক্ষা ও গন জাগরণ নতুনের বার্তা নিয়ে এল ব্রজমোহন বিদ্যালয়। শুরু হল স্বদেশী চেতনায় মানুষ গড়া। শীঘ্রই নাম ছড়িয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে সে আলো ছড়িয়ে গেল সারা উপমহাদেশে। ১৮৮৯ সালে এই স্কুলের ভেতরেই এফ,এ ক্লাশ (এইচ,এস,সি) খোলা হল। ১৮৯৮ সালে বিএ। পিতার শেষ ইচ্ছা অনুসারে প্রতিষ্ঠা হোল ব্রজমোহন কলেজ। তখন বরিশালে জাগে আকাশ,ছোটে বাতাস, আর হাসে সকল ধরা। সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা। অশ্বিনী কুমার দত্তের স্বদেশ মন্ত্রে দীক্ষিত হতে দলে দলে মানুষ ভর্তি হোল বিদ্যালয়ে। শিখল দেশাত্মবোধ, চিনল মা, মাটি মানুষকে। শিক্ষাজীবন শেষে সবাই ফিরে গেল গ্রামে। প্রতিষ্ঠা হোল নতুন নতুন বিদ্যালয় আর শিক্ষকতার মহান জীবন। ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজকে কেন্দ্র করে সারা বরিশালে সৃষ্টি হোল গণজাগরণ। ফলে পরবর্তীতে বরিশাল স্বদেশী আন্দোলনে রাখে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বরিশালকে তখন অনুসরণ করছে সারা ভারত। অবিভক্ত ভারতের কোন কোন রাজ্য তখন বরিশালের মত হতে চাইছে। শুধু কি তাই চিকিৎসা সেবা দিতে অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রতিষ্ঠা করলেন (আনুমানিক ১৯৩৪ সালে) ব্রজমোহন মেডিকেল স্কুল।যেখানে মেডিসিন, মাইনর সার্জারি সহ চারটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদী কোর্স চালু ছিল।শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন, ইন্টার্নশীপ শেষে সনদ ও মেডিকেল সার্ভিস সোসাইটির অনুমোদন এবং সদস্য পদ লাভ করতেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা অনেক চিকিৎসকই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়েছেন।গনজাগরণে চাই গণমাধ্যম। প্রকাশিত হোল করলেন বিকাশ, স্বদেশী, বরিশাল হিতৈষীর মত পত্রিকা। গঠন করলেন বরিশালের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন ‘বরিশাল জনসাধারণ সভা’। অশ্বিনী কুমার দত্ত ছিলেন স্বদেশী বিপ্লবী। তিনি ছিলেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অগ্রনায়ক। ১৯০৫ সালের ৭ নভেম্বর অশ্বিনী কুমার দত্ত সহ ৫ জন নেতা বিলেতী দ্রব্য বর্জনের আহবান জানান। বরিশালে শুরু হয় তীব্র বিদ্রোহ। তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলনে পরিনত করেন। খুলে গেল সব কটা জানাল। অশ্বিনী কুমারের মন্ত্রে দীক্ষিত চারন কবি মুকুন্দ দাস গাইলেন, ছিল ধান গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা।মহাত্মা গান্ধী বললেন, ভারত যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন তখন বরিশাল ছিল সদা জাগ্রত।সেই বরিশাল-আমাদের এই বরিশাল। তাঁর মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানালেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বেজে উঠল অগ্নিবীণা। বললেন, এই নব জাগরণ-আনা নব প্রাতে, তোমারে স্মরিনু বীর প্রাতঃস্মরণীয়!, স্বর্গ হতে এ স্মরণ-প্রীতি অর্ঘ্য নিয়ো!, নিয়ো নিয়ো সপ্তকোটি বাঙালির তব, অশ্রু-জলে স্মৃতি-পূজা অর্ঘ্য্ অভিনব!বরিশালের জাগরনের কবি অশ্বিনী কুমার দত্ত। তোমার জয় হোক।
কৈ! জয় তো হোল না। অশ্বিনী কুমার দত্তের বর্ণ, বিভায় উজ্জ্বল সেই বরিশালেই তিনি আজ উপেক্ষিত। আমরা বিরোধিতা করছি সরকারী বরিশাল কলেজের নাম অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণের। কিন্তু কেন? এখনতো স্বাধীন দেশে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ।তবু কেন এ অকৃতজ্ঞতা! হে মহাত্মা! একবার এসো, শুধু একবার। তোমার সেই স্বপ্নের বরিশালে। তোমার তমাল তলায় বসা সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরনো সেই নবীন ছাত্র, যে ক্লাসের বেঞ্চিতে বসে পা নাড়াতে নাড়াতে একদিন সব জেনেছে। সেই তেজী তরুণ যে আঁধার রাতেও ‘ভোরের আলো’ জ্বেলেছে। শত শত উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী জনতা, ভোর থেকে সড়কে উদ্যানে সৈকতে। সবাই তোমার অপেক্ষায়। ‘কখন আসবে তুমি’? সব কটা জানালা খুলে দাও, সব কটা জানালা খুলে দাও না। আমরা গাইব, আমরা গাইব বিজয়ের গান।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © বরিশাল টিভি ২০১৭