শনিবার, ২৪ Jul ২০২১, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

আমি অশ্বিনী কুমার দত্তের কথা বলছি

আমি অশ্বিনী কুমার দত্তের কথা বলছি

কমল সেন গুপ্ত।। অশ্বিনী ভবনের কতগুলো বিবর্ণ বর্ণমালা গতকাল আমায় বলেছে আমি যেন অশ্বিনী কুমার দত্তের কথা লিখি। আমি তার কথা লিখতে বসেছি। Here Lived Ashwini Kumar Dutta. ফটকের বিবর্ণ তবুও উদ্ভাসিত বর্ণগুলো উচ্চস্বরে গতকাল আমায় বলেছে আমি যেন অশ্বিনী দত্তের কথা লিখি। আমি আজ তার কথা লিখতে বসেছি।এই মাঠ সেদিন ছিল না। দোতালা বাড়ী, তমাল ছায়া ঘেরা। দূর থেকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বাবা বলত, ঐ দেখ অশ্বিনী কুমার দত্তের বাড়ী। সেই ছেলে বেলা উচু জেলে বাড়ীর পুল, সোনালী হল পেরিয়ে ডান দিকে এগিয়ে গেলেই অশ্বিনী ভবন। সন্ধ্যায় এ পথে যেতে যেতে দেখতাম নিচ তলায় একজন লোক চেয়ারে বসে আছেন আর পূর্ব দিকে তাকিয়ে শুধু লিখছেন। বড় হয়ে জেনেছি তিনি সিরাজুল হক স্যার, অধ্যক্ষ। সেই থেকে আমি জানি অশ্বিনী ভবন, বরিশাল কলেজ, ব্রজমোহন বিদ্যালয়, ব্রজমোহন কলেজ যেন এক সুত্রে গাঁথা। সত্য, প্রেম, পবিত্রতার বন্ধনে বাঁধা।
স্বামী বিবেকানন্দ একবার বরিশালে এলেন। উঠলেন ঐতিহ্যবাহী অশ্বিনী ভবনে। যেখানে এসেছেন মহত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মাওলানা শওকত আলী, দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাশ সহ কতশত বিপ্লবী। অশ্বিনী দত্ত স্বামীজিকে নিয়ে গেলেন ব্রজমোহন স্কুলে। স্কুলে তখন পরীক্ষা চলছিল। স্বামীজি দেখলেন পরীক্ষা চলছে কিন্তু কোন গার্ড নেই। সবাই চুপচাপ লিখছে। কৌতুহল বশতঃ স্বামী বিবেকানন্দ অশ্বিনী কুমার দত্তকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তোর স্কুলে গার্ড লাগে না?’ অশ্বিনী কুমার দত্ত বললেন, আমার ছেলেরা নকল করে না। স্বামীজি আনন্দে বলে উঠলেন, অশ্বিনী তোর স্কুলের কয়েকটা ছেলে দে, আমি সমস্ত বিশ্বকে নাড়িয়ে দেই। এই ছিল অশ্বিনী কুমার দত্তের শিক্ষায় জাগ্রত বরিশাল।ব্রজমোহন স্কুল, ব্রজমোহন কলেজকে কেন্দ্র করে বরিশালে যে দেশাত্মবোধ সৃষ্টি হয়েছিল তা স্বদেশী আন্দোলনে তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ অনুসরণ করত।এই হচ্ছে অশ্বিনী কুমার দত্তের প্রিয় বরিশাল।বরিশালকে নিয়ে তাঁর কত আশা, কত না ভালবাসা। তাই হয়ত তিনি বলেছিলেন, এ বাংলায় আমি আবার ফিরে আসতে চাই এবং আবার বরিশালেই জন্মগ্রহন করতে চাই। বরিশাল নিয়ে তাঁর কি আবেগ। একবার শিক্ষাবিদ ক্যানিংহাম ব্রজমোহন বিদ্যালয় পরিদর্শন কালে লিখেছিলেন, বরিশালে ব্রজমোহন বিদ্যালয় থাকতে বাঙ্গালী কেন অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়তে যায় আমি বুঝি না। অশ্বিনী কুমার দত্ত এ ভাবেই বরিশালকে শিক্ষায় জাগ্রত করে উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে গেছেন। ১৮৮৯ সালে ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বরিশালকে আলোয় আলোকময় করলেন।যে আলো ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে। সত্য, প্রেম, পবিত্রতার আলোকে আলোকিত হলেন লাখো ছাত্র। যা অশ্বিনী কুমার দত্তেরই অবদান। সেই সময়ে বরিশাল ছিল উপমহাদেশে অনন্য। সেই বরিশাল। আমাদের এই বরিশাল।
মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত বরিশালকে যে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তা কোনদিন মুছে ফেলার নয়। বরিশাল নগরী তারই দানে ও শিক্ষা কল্যানে গড়ে ওঠা।উপমহাদেশ খ্যাত দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন স্কুল, ব্রজমোহন কলেজ তারই মহান অবদান। বরিশালের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তীর্থভূমি অশ্বিনী কুমার হল তারই মহান কর্ম। বর্তমান সরকারী বরিশাল কলেজ তাঁরই বসতঃ বাড়ীতে স্থাপিত। সেই মহাত্মার স্মৃতিঘেরা বাড়িটি আমরা ভেঙ্গে ফেলেছি। সরকারী অশ্বিনী কুমার কলেজ নামকরনের বিরোধীতা করছি। হায়! হায়!‘সত্য’ হাঁপিয়ে উঠেছে? ‘প্রেম’ ঝরে গেছে? ‘পবিত্রতা’ কি আবর্জনার স্তূপে চাপা পরেছে? অশ্বিনী ভবনের স্মৃতি আজ বিলুপ্ত। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর স্মৃতিঘেরা শতাব্দী প্রাচীন তমাল গাছটি। নিঃসঙ্গ, একাকী। হয়ত হাসছে। আমাদের এই সীমাহীন অকৃতজ্ঞতা দেখে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © বরিশাল টিভি ২০১৭