শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?

শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?

কমল সেন গুপ্ত।। সাহান আরা বেগম। আমাদের সানু আপা।কারো বা ভাবী। সজীবতা ও মানবিক গুনাবলীতে সমৃদ্ধ একজন মানুষ। শব্দাবলী উদীচী হয়ে খেলাঘর, প্রেসক্লাব থেকে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট সর্বত্রই ছিল অবাধ বিচরণ। অগনিত মানুষের প্রিয়জন হিসেবে প্রাণ উজার করা ভালবাসা দিয়ে চির বিদায় নিলেন। হারিয়ে গেল আমাদের ‘শোলক বলা কাজলা দিদি’। বাশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ দেখে আমরা তাকে খুঁজে ফিরি।
পঁচাত্তরের কালো রাতের কাহিনী যে শোনাত শ্লোকের মত, অবিরত। শরীরে লাগলো হায়েনার গুলি। গুলিবিদ্ধ সন্তান। মা! মা! রবে কাতর চিৎকার। ছোট্ট শিশুর যন্ত্রণার চিৎকারে কেঁপে ওঠে ধরণী। কাঁদে মায়ের অন্তর। টলে না খুনীর হৃদয়। অবিরাম গুলি। মায়ের রক্ত আর সন্তানের রক্ত মিশে পুবাকাশে ওঠে লাল সূর্য। রক্ত জবা আরও রক্তিম হয়। শিশু সুকান্ত বাবুর শরীর থেকে রক্ত ঝরতে ঝরতে একসময় নিথর হয়ে পড়ে।শিশু হত্যার বিক্ষোভে সেদিন কাঁপে বসুন্ধরা।বলতে বলতে থেমে যান সানু আপা। হৃদয়ে তখন ঝড় ওঠে, বহে কালবোশেখী। দুরন্ত বেগে। চোখে শ্রাবন ধারা।নীরবে। ঝড় থামিয়ে আবার বলা শুরু করেন শহীদ জননী।সন্তান হারা মা।দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে হাসপাতালে। গুলিবিদ্ধ সানু আপার। সে যাত্রা বেঁচে যান তিনি।
ফেব্রুয়ারী ২০১৭। সানু আপার সাথে দেখা করতে গেলাম কালীবাড়ী রোডের বাসায়।যার নাম বাবার মুখে শুনেছি কতশত বার।তার ছাত্রী ছিলেন সানু আপা।বাবা গর্ব করে বলতেন, দেখা হলেই সানু আমার পা ছুঁয়ে করে সালাম করে।আমাদের দেখা মাত্র সাদরে গ্রহন করলেন। পাশে বসালেন। কত কথা।ভক্তি ভরে স্মরণ করলেন বাবাকে। শুধু বাবা নয় বললেন বরিশালের অনেক শিক্ষকদের নাম। ঠিক যেন সেই শোলক বলা কাজলা দিদি। ৯৭-৯৮ সালে বাবা একদিন গিয়েছিলেন তাঁর সাথে দেখা করতে। সেও এক আবেগময় মুহূর্ত। বাবাকে পেয়ে সেকি খুশী।অনেক কথা। এক সময় বললেন, স্যার যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।ওদের শাষন করতে পারেন না। আমার তো আপনাকে দেখলেই ভয় লাগে।সেকি ভক্তি। সেকি বিশ্বাস। এমন কথা বলার কেউ আর রইলো না। উদীচী, শব্দাবলী, প্রেসক্লাব,বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট সব জায়গায়ই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। যেতেন, কথা বলতেন। শৈশবের বন্ধুদের নিয়মিত খোঁজ নিতেন। পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। গান গাইতেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল অবিকল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মত।গান শুনলে মন ভরে যেত।

না ফেরার ঠিকানায় সানু আপা। অশান্ত বীণা ঝংকার তুলছে আমার অন্তরলোকে। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি। আর ফিরবে না আমাদের সানু আপা। কেউ আর বলবে না ৭৫ এর ভয়াল রাতের কাহিনী। মোবাইলে কল ব্যাক করবে না কেউ। শোনা যাবে না তাঁর গান। কেউ আর স্নেহ ভরা কণ্ঠে বলবে না ‘ তুমি তো দেখতে একদম পি,কে সেন স্যারের মত’। হারিয়ে গেছে সানু আপা। আমাদের শোলক বলা কাজলা দি দি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © বরিশাল টিভি ২০১৭
Design By MrHostBD